যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডার্পা (DARPA) সম্প্রতি এমন এক প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালিয়েছে, যা বৈদ্যুতিক জগতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। গবেষণাগারে নয়, বাস্তবে তারা তারবিহীনভাবে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরত্বে বিদ্যুৎ পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। এ সাফল্য শুধু প্রযুক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে উন্মুক্ত হলো স্মার্ট সিটি, দুর্যোগপূর্ণ অঞ্চল এবং মহাকাশ অভিযানে বিদ্যুৎ সরবরাহের এক বৈপ্লবিক অধ্যায়।
বৈদ্যুতিক শক্তি আবিষ্কারের পর থেকে মানবসভ্যতা বিশাল অগ্রগতি অর্জন করলেও, এখনো পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ পৌঁছানো এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অবকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন, সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে বিশাল খরচ ও সময় ব্যয় হয়। ঠিক এই জায়গাতেই বিপ্লব ঘটাতে চলেছে ডার্পার তারবিহীন বিদ্যুৎ প্রেরণ প্রযুক্তি।
এই গবেষণার মূল ভিত্তি হলো লেজারভিত্তিক অপটিক্যাল পাওয়ার ট্রান্সফার। সহজভাবে বলতে গেলে, উচ্চশক্তির লেজার রশ্মির মাধ্যমে বিদ্যুৎকে আলোর রূপে রূপান্তরিত করে তা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পাঠানো হয়। নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপিত ফটোভোল্টিক সেল বা অনুরূপ ডিভাইস সেই আলোকে পুনরায় বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন হয় না কোনো তার বা বিদ্যুৎ লাইনের।
ডার্পা তাদের ‘POWER’ প্রোগ্রামের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে এ বছরের মে মাসে একটি সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করে। তারা ৮.৬৬ কিলোমিটার দূরত্বে ৮০০ ওয়াটেরও বেশি শক্তি পাঠাতে সক্ষম হয়। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের সেই পরীক্ষায় এক মেগাজুলেরও বেশি বিদ্যুৎ স্থানান্তর করা হয়, যা পূর্ববর্তী সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। পরীক্ষার অংশ হিসেবে তারা পাঠানো বিদ্যুৎ দিয়ে দূরবর্তী একটি স্থানে পপকর্ন তৈরি করেও দেখান, যা প্রযুক্তিটির বাস্তবমুখী ব্যবহারের এক আকর্ষণীয় উদাহরণ।
তবে এই প্রথমবারের মতো এমন কিছু হয়নি। উনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা বিদ্যুৎকে বেতারে প্রেরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার বিখ্যাত টেসলা কয়েল এবং ওয়ার্ডেনক্লাইফ টাওয়ার প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড ব্যবহার করে পরীক্ষানিরীক্ষা চালান। কিন্তু সময়ের সীমাবদ্ধতা ও অর্থনৈতিক কারণে তার সেই স্বপ্ন তখন বাস্তবে রূপ নেয়নি।
আজ সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্নই ডার্পা বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে এনেছে। গবেষকরা বলছেন, এই প্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ পাঠানো সম্ভব হবে আকাশে ভেসে থাকা ড্রোন, মহাকাশযান এমনকি স্যাটেলাইটেও। দুর্যোগ বিধ্বস্ত অঞ্চলে, যেখানে বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়, সেখানেও তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ পাঠানো সম্ভব হবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে।
তবে এর পাশাপাশি কিছু নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগও রয়েছে। লেজার রশ্মি ভুল লক্ষ্যে পৌঁছালে তা ক্ষতিকর হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন অত্যন্ত নির্ভুল টার্গেটিং সিস্টেম এবং সুরক্ষিত অপারেশনাল প্রোটোকল। পাশাপাশি এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োগ করতে হলে প্রয়োজন আরও গবেষণা, দক্ষ জনবল এবং সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডার্পার এই সাফল্য বিদ্যুৎ প্রযুক্তিতে এক যুগান্তকারী ধাপ। এটি যেমন আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে, তেমনি নাগরিক জীবনে প্রযুক্তির প্রবেশকে আরও গতিশীল করে তুলবে। তবে এ যাত্রা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। সামনে আরও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উন্নয়ন এবং বাস্তবায়নের পথ পাড়ি দিতে হবে।
সূত্র: https://www.youtube.com/watch?v=NFeRpUovhuI